১. প্রাথমিক পরিচয় ও পটভূমি:
·
পূর্ণ নাম: সোরাকা ইবনে মালিক ইবনে জু'শুম আল-কিনানি আল-মাদলাজি।
·
উপাধি: আবু সুলায়মান।
·
গোত্র: বনু মুদলিজ গোত্রের সদস্য, যা কিনানা গোত্রের একটি শাখা।
তিনি মক্কার আশেপাশের বেদুইন গোত্রগুলোর মধ্যে একজন সম্মানিত ও সাহসী ব্যক্তি
ছিলেন।
২. হিজরতের সময় সর্বাধিক পরিচিত ঘটনা:
ইসলামের
ইতিহাসে সোরাকা (রা.)-এর নাম চিরস্মরণীয় হয়ে আছে নবীজি (সা.)-এর মক্কা থেকে
মদিনায় হিজরতের সময় ঘটে যাওয়া একটি অলৌকিক ঘটনার কারণে।
·
পিছনের কথা: যখন নবীজি (সা.) এবং তাঁর সঙ্গী আবু বকর (রা.) মদিনার উদ্দেশ্যে
রওনা হন, তখন কুরাইশ নেতারা তাদের জীবিত বা মৃত অবস্থায় ধরে আনার জন্য ১০০
উটের পুরস্কার ঘোষণা করে। এই পুরস্কারের লোভে অনেকেই তাদের অনুসন্ধানে
বের হয়।
·
সোরাকার
অনুসরণ: সোরাকা (রা.)ও এই
পুরস্কারের সংবাদ শুনে তার ঘোড়া নিয়ে তাদের খোঁজে বের হন। তিনি তাদের সন্ধান
পেয়ে যান এবং দ্রুত ঘোড়া চালিয়ে তাদের কাছে পৌঁছে যান।
·
অলৌকিক ঘটনা: যখন সোরাকা নবীজি (সা.)-এর খুব কাছাকাছি চলে আসেন, হঠাৎ তাঁর
ঘোড়াটির পা মরুভূমির বালিতে ডুবে যায় এবং সে পড়ে যায়। তিনি উঠে আবারও আক্রমণের
চেষ্টা করলে আবারও একই ঘটনা ঘটে। এবার তাঁর ঘোড়াটির সামনের দু'টি পা বালিতে ডুবে
যায় এবং সে আর উঠতে পারে না।
·
নবীজির সাথে
কথোপকথন: এ অবস্থায়
সোরাকা বুঝতে পারেন যে, এই ব্যক্তির সাথে divine বা ঐশ্বরিক কিছু একটা জড়িত। তিনি
ভয়ে যান এবং ক্ষমা প্রার্থনা করেন। নবীজি (সা.) তাঁকে ক্ষমা করে দেন। তখন সোরাকা
তাদের জন্য কিছু খাবার ও জিনিসপত্র এনে দেন। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে কথা
বলেন, তা হলো তিনি অনুরোধ করেন যে ভবিষ্যতে যখন নবীজি বিজয়ী হবেন, তখন যেন তিনি
(সোরাকা) নিরাপদ থাকেন।
·
ভবিষ্যতবাণী: এসময় নবী মুহাম্মাদ (সা.) সোরাকাকে একটি অলৌকিক নিদর্শন
দেখান। তিনি সোরাকাকে পারস্যের সম্রাট (কিসরা) এর যে দুটি চুড়ি (বালা) তিনি
পরতেন, সেগুলো তিনি পরতে পারবেন এমন একটি ভবিষ্যতবাণী করেন। এটি ছিল একটি অত্যন্ত
সাহসী ভবিষ্যতবাণী, কারণ তখন পারস্য সাম্রাজ্য ছিল বিশ্বের সর্বশক্তিমান দুটি
সাম্রাজ্যের একটি।
৩. ইসলাম গ্রহণ:
এই ঘটনার পর সোরাকা (রা.)-এর হৃদয়ে ইসলামের বীজ রোপিত হয়, যদিও
তিনি তখনই ইসলাম গ্রহণ করেননি। পরবর্তীতে মক্কা বিজয়ের বছর (৮ম হিজরি) তিনি
ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং একজন খাঁটি মুসলিম হিসেবে জীবনযাপন শুরু করেন।
৪. ভবিষ্যতবাণীর বাস্তবায়ন:
নবীজি (সা.)-এর ভবিষ্যতবাণীটি অক্ষরে অক্ষরে সত্যে পরিণত হয়।
খলিফা উমর (রা.)-এর যুগে মুসলিম বাহিনী পারস্য সাম্রাজ্য জয় করে। সোরাকা (রা.)-কে
খলিফা উমর (রা.)-এর দরবারে ডাকা হয় এবং পারস্যের সম্রাটের সেই বিখ্যাত দুটি চুড়ি
(বালা) তাঁকে পরিয়ে দেওয়া হয়। সোরাকা (রা.) তখন নবীজির সেই দিনের কথা স্মরণ করে
আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এবং সাক্ষ্য দেন যে এটি ছিল নবী মুহাম্মাদ (সা.)-এর একটি
মুজিজা বা অলৌকিক নিদর্শন।
৫. মৃত্যু:
সোরাকা
ইবনে মালিক (রা.) খলিফা উসমান (রা.)-এর শাসনামলে ২৪ হিজরি সন মোতাবেক
৬৪৪ বা ৬৪৫ খ্রিস্টাব্দে মদিনায় ইন্তেকাল করেন।
জীবনী থেকে শিক্ষা:
১.
আল্লাহ তা'আলা তাঁর প্রেরিত নবীর রক্ষাকারী। তিনি যে কোনো শত্রুর হাত থেকে তাঁকে
রক্ষা করতে সক্ষম।
২. নবী মুহাম্মাদ (সা.)-এর অনেক ভবিষ্যতবাণী অলৌকিকভাবে সত্যে পরিণত হয়েছে, যা
তার নবুয়তের প্রমাণ।
৩. সোরাকা (রা.)-এর জীবনী দেখায় যে, কেউ যদি সত্যের সন্ধান পায় এবং তাতে বিশ্বাস
স্থাপন করে, তবে আল্লাহ তার অতীত ক্ষমা করে দেন এবং তাকে সম্মানিত করেন।


No comments:
Post a Comment