এটি সর্বজন স্বীকৃত যে, দুর্নীতি দারিদ্র্য হ্রাস ও উন্নয়নের অন্যতম প্রধান বাধা। বাংলাদেশে দুর্নীতির আশপাশ বিষয়গুলো দৈনন্দিন আলোচনা এবং সাধারণ মানুষের উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দু। দুর্নীতি নিয়ে প্রায়ই গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়। জাতীয় নীতি ও কৌশলগত কাগজপত্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, আইন প্রয়োগের কথা বলা হয়েছে। বাস্তবে এর প্রতিফলন দেখা যায় কম। দুর্নীতির কার্যকর প্রতিরোধের জন্য একটি জনবান্ধব ও দরিদ্র সমর্থক প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হয় কথায়। কিন্তু কাজকর্মে তেমন কার্যকর দেখছি না। সরকার প্রধান দুর্নীতির বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতিতে জোর দিচ্ছে। এর পরও কেন দুর্নীতি কমছে না! প্রধানমন্ত্রীর চেষ্টার কমতিও নেই। তাই কোথায় আমাদের দুর্বলতা রয়েছে, সেটি খতিয়ে দেখা একান্ত জরুরি। কারণ দুর্নীতি আমাদের টেকসই উন্নয়নের বড় অন্তরায়। উন্নয়ন বারবার বাধার সম্মুখীন হচ্ছে দুর্নীতির কাছে। বর্তমান সরকার ধারাবাহিকভাবে তিনবার ক্ষমতায়। ফলে দৃশ্যমান উন্নয়ন হয়েছে অনেক। নিজেদের অর্থায়নে আমাদের স্বপ্নের সেতু পদ্মা বাস্তবায়ন করতে পেরেছি। এটি বর্তমান সরকারের বড় সফলতা ও অর্জন এবং তা নিয়ে আমরা গর্বিত। কিন্তু দুর্নীতির কারণে সব অর্জন মানুষের কাছে ম্লান হয়ে যায়। হাজার হাজার কোটি টাকা দেশ থেকে পাচার হয়ে যাচ্ছে। এই অর্থপাচার বন্ধে তেমন কার্যকর উদ্যোগ দেখছি না। বিদেশে অর্থপাচার ও দুর্নীতি বন্ধ করতে পারলে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা অনেক আগেই অর্জন করতে পারতাম। অর্থাৎ দুর্নীতিবাজদের জন্য বারবার দেশ পিছিয়ে পড়ছে। তারা জনগণের টাকা বিদেশে পাচার করে সেকেন্ড হোম বানাচ্ছে। ২০২১ সালের শেষে সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমা হওয়া অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৭ কোটি ১১ লাখ সুইস ফ্রাঁ বা ৮ হাজার ২৭৬ কোটি টাকা। ২০২০ সালে তা ছিল ৫৬ কোটি ২৯ লাখ সুইস ফ্রাঁ বা ৫ হাজার ৩৪৮ কোটি টাকা। ওই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে বেড়েছে ২ হাজার ৯২৮ কোটি টাকা বা ৫৫ শতাংশ। বর্তমান সরকার যখন ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসে, তখন সুইস ব্যাংককে বাংলাদেশিদের জমা রাখা অর্থের পরিমাণ ছিল ৯৫২ কোটি টাকা। ওই তুলনায় শত শত গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে এই কয়েক বছরে। অর্থাৎ সরকার টাকা পাচার বা বিদেশের ব্যাংককে টাকা জমা রাখা বন্ধে তেমন প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিতে পারছে না। ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারলে এত টাকা পাচার হতো না। আর অর্থপাচার বা দুর্নীতি বন্ধ করতে পারলে দেশ অনেক আগেই সিঙ্গাপুরের মতো উন্নত দেশে রূপান্তর হতো। আমাদের দুর্ভাগ্যের বিষয়, আমরা দুর্নীতির রোষানলে পড়ে সব উন্নয়নকে বাঁধাগ্রস্ত করছি। বিশ্বের অন্যান্য দেশের কাছে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারছি না। কেন আসলে দুর্নীতির কালো বিড়াল বের করছি না! কালো বিড়াল ধরতে গেলে রাঘববোয়াল বের হয়ে আসবে- এই ভয়তে কি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তেমন কোনো কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করছে না? দেশে আর্থিক সংকট চলছে। আমরা অনেকেই করোনা মহামারী, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধকে দায়ী করে থাকি। হ্যাঁ, আমি স্বীকার করি- এসব কারণ আজকের অর্থনৈতিক সংকটের জন্য দায়ী। কিন্তু সম্পূর্ণভাবে দায়ী নয়। আমরা অনেকেই মনে করি, দুর্নীতি আজকের সংকটের জন্য প্রধানভাবে দায়ী। দুর্নীতি না থাকলে আজকে দেশ এত অর্থনৈতিক সংকটে পড়ত না বলে মনে করি। দেশের অধিকাংশ মানুষও সেটিই মনে করে বলে আমার বিশ্বাস। অনেককেই দুর্নীতি করেও বিচারের সম্মুখীন হতে হয় না। দুর্নীতি করে যদি মানুষ সমাজে সুন্দরভাবে বসবাস করতে পারে, তা হলে তো লোকজন দুর্নীতিতে জড়িত হবে- এটিই স্বাভাবিক। জাতীয় ও আর্থসামাজিক কর্মকা-ের বিভিন্ন স্তরে দুর্নীতি হতে পারে। রাজনীতি, প্রশাসন ও বেসরকারি খাতে সম্পৃক্ততার সঙ্গে নীতি পর্যায়ের প্রভাবশালীদের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ক্ষমতার অপব্যবহার করে মোটা অঙ্কের অর্থের অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে দুর্নীতি হয়। কারা এই প্রভাবশালী? তাদের কি দুর্নীতি দমন কমিশন খুঁজে পায় না! ২০১৭ সালের টিআইবির জরিপের ফল থেকে দেখা গেছে ৬৬.৫% পরিবার সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সেবা গ্রহণের সময় দুর্নীতির সম্মুখীন হয়েছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো (৭২.৫%) সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত খাত হিসাবে স্থান পেয়েছে। দুর্নীতিতে পরের স্থানে রয়েছে পাসপোর্ট (৬৭.৩%), বিআরটিএ (৬৫.৪.%), বিচার বিভাগীয় পরিষেবা (৬০.৫.%), ভূমি পরিষেবা (৪৪.৯%), শিক্ষা (৪২.৯%), স্বাস্থ্য (৪২.৯%) ইত্যাদি। সেবাগ্রহীতা পরিবারের মধ্যে দুর্নীতির শিকারের হার ২০১৫ সালে ছিল ৬৭.৮.%। তা ২০১৭ সালে সামান্য কমে ছিল। ২০২১ সালের ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) জরিপেও দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিশেষ করে পুলিশ ও র্যাবকে সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত খাত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। টিআইবি জানিয়েছে, গত বছরে দেশের জরিপকৃত পরিবারের অন্তত ৭০.৯% কোনো না কোনো ধরনের দুর্নীতির শিকার হয়েছে। জরিপ করা পরিবারের প্রায় ৭৪.৪.% আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে দুর্নীতির শিকার হয়। অর্থাৎ দুর্নীতি অতীতের চেয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। সাধারণত দুর্নীতি কমার কথা। যেখানে দেখা গেছে, ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর (৭০.৫%) এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) সবচেয়ে (৬৮.৩%) দুর্নীতিগ্রস্ত সেবা খাতের মধ্যে দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। ৫৫.৭% পরিবারের তথ্য অনুসারে দুর্নীতির একটি প্রধান রূপ হলো ঘুষ, এর পর অসদাচরণ (১১.৯%), ভয় দেখানো (৮%), মিথ্যা মামলা করা (৫%), একটি সাধারণ ডায়েরি প্রস্তুত করতে বা বিবৃতি নিতে দেরি কিংবা অবহেলা করা (৪.১%), অভিযোগ পাওয়ার পর পদক্ষেপ না নেওয়া (৩.৬%) ইত্যাদি। যারা ঘুষ দিয়েছেন বা ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েছেন, তারা গড়ে ৬ হাজার ৬৯৮ টাকা দিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে মানুষ সবচেয়ে বেশি দুর্নীতির শিকার হয়েছে ট্রাফিক পুলিশের কাছে। গ্রামীণ এলাকায় ৭১.২% পরিবার দুর্নীতির শিকার হয় এবং শহরাঞ্চলে অনুরূপ চিত্র ৭০.৭%। তা টিআইবি জরিপে বের হয়েছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে আইনি পদপে গ্রহণ ও শাস্তি নিশ্চিত করা একান্ত জরুরি। দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত সরকারি কর্মকর্তাদের অবশ্যই ব্যক্তির পরিচয় এবং সামাজিক মর্যাদা উপেক্ষা করে বিচারের আওতায় আনতে হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে দরিদ্র মানুষের জীবন ও জীবিকাকে গুরুত্ব দিতে হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনগণের সচেতনতা ও অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। দুর্নীতি কমাতে দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) শক্তিশালী করা। একই সঙ্গে দুর্নীতির বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ ও প্রকাশে মিডিয়ার ভূমিকা নিরবচ্ছিন্ন হওয়া জরুরি। সেবা খাতে দুর্নীতি দমনে সর্বস্তরে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও এর যথাযথ প্রতিফলন নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থাকে অবশ্যই তাদের পরিষেবা পদ্ধতির সংস্কার করতে হবে- যাতে অপ্রয়োজনীয় পদক্ষেপ, বিলম্ব ও দ্রুত পরিষেবার প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা যায়। দুর্নীতি প্রতিরোধে ইতিবাচক ও নেতিবাচক- উভয় ধরনের প্রণোদনা প্রদানের জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে। এ ছাড়া পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে পুরস্কার ও শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। সেবা খাতে দুর্নীতি দমনে সংশ্লিষ্ট বিভাগের পাশাপাশি দুদককে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
ড. শফিকুল ইসলাম : সাবেক সভাপতি, শিক্ষক সমিতি, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশাল ময়মনসিংহ


No comments:
Post a Comment